সৃজনশীল গ্রন্থ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারীদের অনেককেই নিজেদের পেশাগত পরিচয়ের ক্ষেত্রে “সৃজনশীল প্রকাশক” পরিভাষাটি ব্যবহার করতে দেখা যায়। এটি বহুল ব্যবহৃত হলেও ব্যকরণগতভাবে শুদ্ধ নয়।
কারণ,এখানে ‘সৃজনশীল’ শব্দটি বিশেষন (Adjective)। গুণবাচক এই শব্দটি ‘পুস্তক’ বা ‘বই’ বিশেষ্য (Noun) পদের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে বিশেষন পদটি মোটেই পুস্তক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারীর পেশাগত পরিচয়ের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে না। মানে প্রকাশক নিজে সৃজনশীল নন, তার প্রকাশিত বইটি সৃজনশীল। আরও স্পষ্ট করে বললে, বইয়ের বিষয়বস্ত সৃজনশীল।
পরিভাষাটির শুদ্ধরূপ হওয়া উচিত –
সৃজনশীল পুস্তক প্রকাশক বা সৃজনশীল গ্রন্থ প্রকাশক (Publisher of Creative Books) বা সৃজনশীল সাহিত্য প্রকাশক (Publisher of Creative Literature)।
এগুলো বেশি নির্ভুল হওয়ার কারণ হলো- এখেনে সৃজনশীল শব্দটি প্রকাশককে নয়, প্রকাশিত বস্তু, বিষয় বা গ্রন্থের প্রকৃতিকে সৃজনশীল বলে চিহ্নিত করে।
যদিও দুই বাংলায়ই (বাংলাদেশে ও পশ্চিমবঙ্গ) “সৃজনশীল প্রকাশক” শব্দবন্ধটি প্রচলিত। এর মাধ্যমে সাধারণত বোঝানো হয়- যে প্রকাশক মূলত সাহিত্য, গবেষণা, অনুবাদ, সৃজনশীল গ্রন্থ ইত্যাদি প্রকাশ করেন। অর্থাৎ তিনি পাঠ্যবই, একাডেমিক বই বা purely বাণিজ্যিক প্রকাশনার পরিবর্তে এমন বই প্রকাশ করেন, যা কল্পনা, শিল্পচেতনা ও সৃষ্টিশীল মেধার প্রকাশ ঘটায়।
অর্থাৎ প্রচলিত অর্থে “সৃজনশীল প্রকাশক” মানে দাঁড়ায়— “যিনি সৃজনশীল গ্রন্থ প্রকাশ করেন।” আসলে স্বত্ত্বাগতভাবে সব মানুষই সৃজনশীল। তাই শুধু প্রকাশকের নামের পূর্বে সৃজনশীল বিশেষণ ব্যবহার যৌক্তিক নয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যদি ‘সৃজনশীল প্রকাশক’ পরিভাষাটি গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়, তবে সেই যুক্তিতে ‘সৃজনশীল আড়ৎ ব্যবসায়ী’, “সৃজনশীল মোটর পার্টস ব্যবসায়ী”, “সৃজনশীল গার্মেন্টস ব্যবসায়ী” ইত্যাদি পরিভাষাও গ্রহণযোগ্য হবে। কিন্তু সৃজনশীল শব্দের এরূপ ব্যবহার একেবারেই নেই এবং কেউ করলেও সেটা হাস্যকর দেখাবে।
এক্ষেত্রে সারাদেশের সর্বশ্রেনীর বই ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যিক সংগঠন “বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি” নামটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। এখানে “প্রকাশক সমিতি” বলা হয় নি। বলা হয়েছে “পুস্তক প্রকাশক সমিতি”। একইভাবে এই সমিতির সৃজনশীল পুস্তক ব্যবসায়ীদের জন্য গঠিত স্ট্যান্ডিং কমিটির নামটি এরূপ- “সৃজনশীল সাহিত্য স্ট্যান্ডিং কমিটি”। এগুলো সঠিক ও শুদ্ধ।
এই অর্থে এক সময়কার “বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি” (পরবর্তীতে আদালতের রায়ে বিলুপ্ত) নামটিও ভুল ছিলো। এই নামটি হওয়া উচিত ছিলো “বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল পুস্তক প্রকাশক সমিতি”।
এ বিষয়ে জনতে চেয়েছিলাম বাংলা ভাষার পন্ডিত ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ ঘোষের কাছে। তিনি আমার বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করে বলেছেন, এখানে বইয়ের বিষয়বস্তু বা বইটি ‘সৃজনশীল’, প্রকাশক নন। একটি দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক কবি জাকির আবু জাফরও বিষয়টিতে আমার সাথে একমত পোষণ করেছেন।
বাংলা একাডেমি প্রণীত বাংলা অভিধানে ‘সৃজনশীল’ শব্দের অর্থ দেওয়া হয়েছে—সৃষ্টিশীল, নতুন কিছু সৃষ্টিতে সক্ষম, কল্পনাপ্রসূত ইত্যাদি। এখানে শব্দটি মূলত কোনো কর্ম, চিন্তা বা সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করে।
এই অর্থ অনুযায়ী, ‘সৃজনশীল’ বিশেষণটি অধিকতর উপযুক্ত সাহিত্য, রচনা বা গ্রন্থের জন্য—যেখানে কল্পনা, মৌলিকতা ও শিল্পমান বিদ্যমান।
Oxford University Press–এর Oxford English Dictionary–তে Creative শব্দের অর্থ—Relating to or involving the imagination or original ideas, especially in producing artistic work (অর্থাৎ কল্পনা ও মৌলিক চিন্তার সঙ্গে সম্পর্কিত, বিশেষত শিল্পসৃষ্টিতে ব্যবহৃত)।
এই সংজ্ঞা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, Creative শব্দটি মূলত কাজ, সৃষ্টি বা পণ্য (work/product)–এর গুণ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, ব্যক্তির পেশাগত পরিচয় বোঝাতে নয়। ফলে creative publisher শব্দবন্ধটি সরাসরি ব্যবহার করলে অর্থ দাঁড়ায় প্রকাশক নিজেই সৃজনশীল—যা ভাষাগতভাবে অস্পষ্ট বা ভুল। “সৃজনশীল প্রকাশক” যদিও ভাষাগতভাবে ভুল অথবা বিভ্রান্তিকর, তবুও প্রচলন এতটাই বেশি যে, এটি প্রায় এক ধরনের স্থায়ী পরিভাষা হয়ে গেছে। তবে একাডেমিক, ভাষাতাত্ত্বিক ও যৌক্তিক দিক থেকে “সৃজনশীল গ্রন্থ প্রকাশক” বা “সাহিত্য প্রকাশক” বেশি সঠিক বা শুদ্ধ।
প্রকাশনা শিল্প যেহেতু জ্ঞানার্জনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম, সেহেতু এখানকার এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষার ত্রুটিপূর্ণ ব্যবহার সমর্থনযোগ্য নয়। সেই অর্থে পরিভাষাটি পরিত্যাজ্যই হওয়া উচিত।
Leave a Reply Cancel reply
You must be logged in to post a comment.